সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়, সাইনাসের সংক্রমণ
আমাদের শরীরের জন্য সাইনোসাইটিস, খুবই বিরক্তিকর একটি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। সাইনোসাইটিস মানব শরীরে সাইনাস নামক ফাঁপা অংশে প্রদাহ ও ইনফেকশনের সৃষ্টি করে। এই ইনফেকশনের ফলে নাক বন্ধ, মাথা ব্যথা, কাশি, শারীরিক ক্লান্তি সহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। সাইনোসাইটিস গুরুতর হলে এটি জীবনযাত্রার সঠিক মান নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটায়। যার ফলে, হতাশা এবং উদ্বেগ সহ মনোযোগ কমে যেতে পারে।
তবে চিন্তার কিছু নেই, সাইনোসাইটিস সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ রূপে নিরাময় সম্ভব। চলুন তাহলে আজকের আর্টিকেলটিতে আমরা জানার চেষ্টা করি, সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়? একই সঙ্গে এর কারণ ও লক্ষণ সম্পর্কে।
পোস্ট সূচিপত্রঃ সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়, সাইনাসের সংক্রমণ
- সাইনাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম
- সাইনোসাইটিসের সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণ
- সাইনোসাইটিসের সমস্যার লক্ষণসমূহ
- সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়। সাই নোসাইটিস সমাধানের উপায়
- সাধারণভাবে সাইনোসাইটিসের ঘরোয়া প্রতিকারঃ
- চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবনঃ
- প্রয়োজন হলে সার্জারি লাগতে পারেঃ
- উপসংহার। সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়। সাইনাসের সংক্রমণ
সাইনাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম
আমাদের মাথার ভেতরে বিভিন্ন অংশে সাইনাস বিদ্যমান। সাধারণ ভাবে সাইনাসের কাজ হল, মাথার খুলির ভেতরের বায়ুপূর্ন স্থানগুলো খোলা রাখা। যার ফলে নিশ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ও আরামদায় করে। কথা না বাড়িয়ে চলুন তাহলে, সাইনোসাইটিস কি ভালো হয় আর্টিকেলটিতে, মানব শরীরের জন্য সাইনাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম গুলো জানার চেষ্টা করি।
- মাথার খুলির ভিতরে থাকা সাইনাস গুল নাকের সাথে সংযুক্ত থাকে। এর ফলে নাকের ভেতর দিয়ে, সম্পূর্ণ সাইনাসের ফাঁকা জায়গা গুলিতে বাতাস চলাচলে মসৃন করে, একই সঙ্গে মাথার খুলির ওজন হালকা অনুভব করায়।
- সাইনাস থেকে নিঃসৃত শ্লেষ্মা নাকের ভিতরে আসা বাতাসকে আদ্র এবং উষ্ণ রাখে। একই সঙ্গে এই উষ্ণতার প্রয়োজনীয়তা ফুসফুসের জন্য খুবই উপকারী এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের খুবই আরাম পাওয়া যায়।
- সুন্দর এবং পরিষ্কার কথা বলার জন্য উপকারী প্রভাব ফেলে সাইনাস। সাইনাসের ভিতরে বাতাস জমা থাকার কারণে, এটি কণ্ঠস্বর আরো স্পষ্ট এবং প্রাকৃতিক করে তোলে। একই সঙ্গে কথা বলতেও, আগ্রহ বোধ করায় এবং মাথার খুলির ভেতরে চাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- আমাদের নাক থেকে নেওয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে নাকের ভেতরে যাওয়া, এলার্জেন, ধুরাবালি এবং জীবাণু প্রতিরোধেও কাজ করে। কেননা সাইনাসের ভেতরে মিউকাস নামক শ্লেষ্মা, জীবানু গুলো আটকে দেয় একই সঙ্গে সিলিয়া নামক, ছোট লোম এগুলো বাইরে বের করে দিতে কাজ করে। এর ফলে, সাইনাস সংক্রমণের দেখাও কম মেলে।
সাইনোসাইটিসের সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণ
আজকের আর্টিকেলটি, সাইনোসাইটিস কি ভালো হয় এ ব্যাপারে। আর্টিকেলটিতে ইতিমধ্যেই, সাইনাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের মাথা এবং নিশ্বাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য, সাইনাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলুন এখন এই গুরুত্বপূর্ণ সাইনাসের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য যে সকল কারণ দায়ী, সেগুলো জানার চেষ্টা করি।
- সাইনোসাইটিসের সমস্যা দেখা দেওয়ার সব থেকে সাধারণ কারণ হলো ভাইরাস সংক্রমণ। সাধারণ সর্দি, কাশি এবং জ্বর সহ শরীরে সংক্রমণের দেখা মিললে সাইনাসের প্রদাহ শুরু হতে পারে যার ফলে, সাইনোসাইটিসের মত সমস্যার দেখা মেলে।
- ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ও কোন অংশে কম নয়, ঠান্ডা এবং সর্দি বেশিদিন লেগে থাকলে, এমন সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ছত্রাক সংক্রমণের ফলেও এমন সমস্যার, দেখা মেলা সাধারণ ব্যাপার।
- নাকের ভেতরে পলিপাসের সমস্যা হলে, সাইনাস সংক্রামিত হয়ে সাইনাসাইটিস দেখা দিতে পারে। কেননা নাকের ভেতরে বাড়তি মাংস পিণ্ডের কারণে সাইনাসের নালি বন্ধ হয়ে যায় এবং শ্লেষ্মা বের হতে পারে না যার ফলে এমনটা হতে পারে।
- পরিবেশগত পরিবেশ দূষণ, যেমন ধুলোবালি, যানবাহনের ধোঁয়া, তামাকজাত দ্রব্যের ধোয়াও সাইনাসকে সংক্রমিত করতে পারে। আপনার যদি ঠান্ডা পরিবেশে বার বার যেতে হয় , সেক্ষেত্রে ক্রমাগত শরীরে ঠান্ডা লাগানোর ফলেও নাক বন্ধ হয়ে সাইনাস ব্লক হতে পারে।
- যে সকল ব্যক্তিদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাদের ক্ষেত্রেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ডায়াবেটিস রোগীদের দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের ফলে এমনটা হতেও পারে। তাছাড়া অ্যাজমার মত সমস্যাও সাইনাস কে প্রভাবিত করতে পারে।
- নাকের ভেতরের হাড় বাঁকা থাকলে সাইনাস থেকে শ্লেষ্মা বের হতে বাধাগ্রস্ত হয়। যাদের ধুলোবালি সহ পশু পাখির লোমের সংস্পর্শে আসলে, এলার্জি দেখা দেয় তাদেরও এমন সমস্যা হতে পারে। এছাড়া মুখের উপরের মাড়ির দাঁতে কোন সংক্রমণের দেখা দিলেও, প্রদাহ সাইনাসে ছড়াতে পারে।
সাইনোসাইটিসের সমস্যার লক্ষণসমূহ
সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়? আর্টিকেলটিতে সাইনাসের কার্যক্রম এবং সাইনোসাইটিস হওয়ার কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সাইনাস যখন স্বাভাবিক কার্যক্রম সঠিকভাবে করতে না পারে, তখন সাইনাসের নালি বন্ধ হয়ে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমনের দেখা মেলে। এ সময় সাধারণত গালের হাড়ের নিচে, চোখের চারপাশ সহ কপালে চাপ বা ব্যথার দেখা দেয়। নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে ঘন শ্লেষ্মা বের হওয়া, মাথাব্যথা, জ্বর, মুখে দুর্গন্ধ সহ দাঁত ও মারিতে চাপ ও ব্যথা অনুভব হতে পারে।
সাইনোসাইটিস একটু গুরুতর ক্ষেত্রে, মনোযোগ দিতে অসুবিধা, ক্লান্তি , কাশি সহ নাকের ঘ্রান শক্তি ও স্বাদ কমে যেতে পারে। সাইনোসাইটিস সর্বোচ্চ তীব্র স্থলে পৌঁছে গেলে চোখের চারপাশে তীব্র ব্যথা সহ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে শরীরে অতিমাত্রায় জ্বরের দেখা মিলতে পারে। আপনার এমন লক্ষণ দেখা দিলে এজন্য অবশ্যই, একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।
সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়। সাইনোসাইটিস সমাধানের উপায়
সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়? আজকের আর্টিকেলটির আলোচ্য বিষয় এটি। সাইনোসাইটিস সাধারণত সাইনাসের প্রদাহ বা সংক্রমণের কারণে হয়, এবং এটি সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য, তা শুরুতেই বলা হয়েছিল। সাইনোসাইটিস অর্থাৎ সাইনাসের সংক্রমণ রোধে, ঘরোয়া প্রতিকারের পাশাপাশি ওষুধ সেবন সহ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। আপনার সমস্যার ধরন অনুযায়ী, যথাযথ ব্যবস্থা জরুরী সমাধানের জন্য। কথা না বাড়িয়ে চলুন তাহলে জানার চেষ্টা করি, সাইনোসাইটিসের সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে।
সাধারণভাবে সাইনোসাইটিসের ঘরোয়া প্রতিকারঃ
- সাইনোসাইটিসের সমস্যায় প্রাথমিক অবস্থায় আপনি, একটি পাত্রে কিছু গরম পানি নিয়ে, তার উপরে একটি রুমাল বা কাপড় দিয়ে গরম সেক, নিতে পারেন। একই সঙ্গে গরম পানির বাম্প নিলেও উপকার মিলতে পারে।
- নাক সুন্দরভাবে পরিষ্কার করার জন্য, হালকা উষ্ণ গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে তা ব্যবহার করতে পারেন। এটাও উপসর্গ কমায়, নাকের ভেতরের ময়লা, আবর্জনা সহ ব্যাকটেরিয়া রোধ করে।
- সাইনাসের সংক্রমনে, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাও অত্যন্ত জরুরী। কেননা শরীরে পানি কমে গেলে শ্লেষ্মা ঘন হয়ে যায়। এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে ভুলবেন না।
- ধুলোবালি, বায়ু দূষণ এড়িয়ে চলুন, বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। ধুলোবালি এবং বায়ু দূষণে আপনার এলার্জির প্রভাব দেখা দিলে এন্টিহিস্টামিন বা নাসাল স্প্রে ব্যবহারেও উপকার মিলতে পারে।
- শ্লেষ্মা পাতলা করে বের করে দেওয়ার জন্য, আদা, লেবু, মধু এবং গরম পানি মিশিয়ে তা খেতে পারেন। গরম স্যুপ খাওয়া এ সময় উপকারী। ঘুমানোর আগে মাথা উঁচু করে ঘুমাতে পারেন যাতে নিঃশ্বাস চলাচল সহজ হয়।
চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবনঃ
- সাইনোসাইটিসের সমস্যা, তীব্রতার উপর ভিত্তি করে সমাধানের জন্য ওষুধ সেবন করা লাগতে পারে। তবে এজন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। সাইনাসের সমস্যা যদি কোন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলে, তীব্র আকার ধারণ করে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে সমাধানে আনা সহজ হতে পারে।এজন্য চিকিৎসক আপনার সমস্যার তীব্রতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক দিতে পারে।
- শরীরের তীব্র এলার্জির সমস্যার ক্ষেত্রে যদি সাইনাসের সংক্রমণ ঘটে সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক এন্টিহিস্টামিন স্প্রে বা সেটিরিজিন ট্যাবলেট খেতে দিতে পারে। নাকের ফোলা ভাব ও বন্ধ ভাব কমাতে, নাসাল ডিকনজেসটেন্ট স্প্রে ব্যবহারও করতে হতে পারে।
- আপনার স্বাভাবিক সংক্রমণ যদি দীর্ঘমেয়াদি বা তীব্র হয়। এজন্য চিকিৎসক আপনাকে নাসাল স্টেরয়েড, ব্যবহারেও উৎসাহিত করতে পারে। আপনি যেকোন ঔষধ সেবন করেন না কেন , অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে।
প্রয়োজন হলে সার্জারি লাগতে পারেঃ
সাইনোসাইটিসের সমস্যায় কোন, কোন রোগির জন্য সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। যখন কোন রোগীর, ঘরোয়া চিকিৎসা সহ কোন প্রকার ওষুধে কাজ হয় না, সে ক্ষেত্রেই সার্জারি করার প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া নাকের ভেতরটা যদি পলিপাসের কারণে, সাইনাস বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে নাকের ভেতরের কাঠামোগত সমস্যার কারণে বন্ধ হলে।
দীর্ঘস্থায়ী উপশমের জন্য এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করতে হতে পারে। এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি খুবই সাধারণ পদ্ধতি। এর ফলে নাকের ভেতর দিয়ে পাতলা এন্ডোস্কোপ ব্যবহার করে সাইনাসের মুখ প্রশস্ত করা হয়। সাধারণত এই ধরনের সার্জারিতে তেমন কোন ঝুকিও থাকে না।
উপসংহার। সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়। সাইনাসের সংক্রমণ
সাইনোসাইটিস কি ভালো হয়? সাইনাসের সংক্রমণ সম্পর্কে ইতিমধ্যে বেশ কিছু তথ্যই তুলে ধরা হয়েছে। আপনার যদি সাইনাসের সংক্রমনের দেখা মেলে, সে ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী। দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেলে এটি আপনাকে খুব বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার করতে পারে। আপনার যদি সাইনাসের সমস্যা ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি থাকে, চোখে সমস্যা, জ্বর সহ বার বার সাইনোসাইটিস এর সংক্রমণ দেখা দেয়। এজন্য একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া আপনার জন্য জরুরী।
সাইনোসাইটিসের সমস্যার সমাধান আপনি যেমনই ব্যবস্থা নেন না কেন, কোন প্রকার ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরী, মাথায় রাখবেন। কেননা আপনার সাবধানতাই পারে, আপনাকে সুস্থ এবং সুন্দর জীবন যাপন উপহার দিতে।
(খোদা হাফেজ)



ভদ্রতা বজায় রেখে কমেন্ট করুন! কারন,প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url