ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষন ও প্রতিকারের উপায়
আমাদের প্রত্যেকেরই শরীরে স্বাভাবিক মাত্রায় ইউরিক এসিডের পরিমাণ থাকে। ইউরিক এসিড হলো পিউরিন নামক রাসায়নিক পদার্থের বিপাক। এর ফলে শরীরে প্রাকৃতিক বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয়, এবং প্রসাবের সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে শরীরে যদি উচ্চ মাত্রায় ইউরিক এসিডের দেখা মেলে, সে ক্ষেত্রে গাটে ব্যাথা ও কিডনিতে পাথর সহ, বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, আপনার শরীরে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে সমাধান সম্ভব।
এজন্য খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের সাথে আপনার তীব্রতার উপর নির্ভর করে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন, করতে হতে পারে। চলুন তাহলে, ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ সহ কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।
পোস্ট সূচিপত্রঃ ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়া লক্ষন ও প্রতিকারের উপায়
রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার কারণ
আমাদের প্রতিটা মানুষের শরীরে পরিমাণ মতো ইউরিক অ্যাসিড থাকে। ইউরিক এসিড প্রধানত রক্তে থাকে, যা পিউরিন নামক রাসায়নিক ভেঙে তৈরি হয় একই সঙ্গে কিডনির মাধ্যমে আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। যদি ইউরিক এসিডের পরিমাণ শরীরে বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে। চলুন আমরা রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ সম্পর্কে জানার আগে, বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।
- সাধারণত রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ গুলোর মধ্যে খাদ্যাভ্যাস অন্যতম। দৈনন্দিনীর খাদ্য তালিকায়, পিউরিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই সকল খাবারের মধ্যে, লাল মাংস, কলিজা, মগজ অতিমাত্রায় পিউরিন থাকে। ইলিশ মাছ, কাকড়া, চিংড়ি, সার্ডিন, টুনাতেও পিউরিন রয়েছে। কিছু সবজি যেমন পালং শাক, ফুলকপি, মাশরুমে কিছু পরিমাণে পিউরিন মেলে।
- চিনি যুক্ত খাবার ও পানীয় খাওয়ার ফলে, রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। উচ্চ চিনি যুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত সহ সফট ড্রিংক রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়ায়। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের ফলে ও, রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়ায় সঙ্গে নিঃসরণে বাধা দেয়।
- রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা ঠিক রাখতে, শারীরিকভাবে জীবনধারার গুরুত্ব ও কম না। শরীরে যদি অতিরিক্ত ওজন থাকে সঙ্গে হঠাৎ করে দ্রুত ওজন কমে যায়, তাহলে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়তে পারে। শারীরিক পরিশ্রম ইউরিক এসিডের মাত্রা, সক্রিয় রাখতে কাজ করে।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা ইউরিক এসিডের মাত্রা বজায় রাখতে জরুরি। শারীরিক সুস্থতায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা এবং সময় মত খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবেন, না হলে এমন সমস্যার মোকাবেলা করতে হতে পারে।
- শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন, কিডনির বিকলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ সহ থাইরয়েডের সমস্যা দেখা মেলে। সে ক্ষেত্রে কিডনি শরীর থেকে ঠিকমতো ইউরিক এসিড বের করতে পারেনা, যার কারণে রক্তে জমা হয়।
- রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আপনার, বংশগত কারণে ও দেখা দিতে পারে। পূর্বে কারো এমন ইতিহাস থাকলে, ঝুঁকি রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ, ক্যান্সারের কেম থেরাপি সহ শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার ফলেও এমনটা দেখা দিতে পারে।
ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ
আজকের আর্টিকেলটির মূল বিষয়, ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ সম্পর্কে। মাত্রই ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। শরীরে রক্তে অতিরিক্ত পিউরিন তৈরি হলে একই সঙ্গে এই পিউরিন বের না হলে, ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়। এ সময়, হাত পায়ের গেটে ব্যথা, কিডনির সমস্যা সহ ক্লান্তি ও জ্বরের মতো লক্ষণ অনুভব হতে পারে। কথা না বাড়িয়ে চলুন, রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া লক্ষণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।
আরো পড়ুনঃ শরীরে রক্ত কম হওয়ার লক্ষণ ,এবং করনীয় কি?
সাধারণ যে সকল লক্ষণ দেখা দিতে পারেঃ
শরীরে ইউরিক অ্যাসিড, বেড়ে গেলে সাধারন ভাবে তেমন কোন উপসর্গ, দেখা নাও দিতে পারে। তবে প্রাথমিক অবস্থায়, শারীরিক ক্লান্তি ও দুর্বলতার দেখা মিলতে পারে। শরীরে অস্বস্তি সহ অল্প পরিশ্রমে, খুবই হাপিয়ে যাওয়া সহ শরীরের ভেতরে প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে।
তাছাড়া এমন সমস্যার প্রভাব শরীরে দেখা দিলে, কখনো কখনো হালকা বা মাঝারি আকারের জ্বরের দেখা মিলতে পারে। এই লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ লক্ষণ, ইউরিক এসিড তীব্র আকারে বেড়ে গেলে, নিম্নে উল্লেখিত লক্ষণ গুলো দেখা দেয়।
গেটে বাত জনিত সমস্যাঃ
রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে, শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টের সমস্যা অনুভব হতে পারে। এ সময় হঠাৎ করে পায়ের বুড়ু আঙ্গুলে তীব্র ব্যথা, গাট লাল হয়ে যাওয়া, হাত বা পা নাড়াচাড়া করতে কষ্ট হওয়ার মত লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এমন ব্যথার প্রবণতা, দিনের থেকে রাতের বেলা বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
পায়ের বুড়ো আঙ্গুল থেকে শুরু হলেও, এই ব্যথা হাঁটু, গোড়ালি, কবজি এবং কনুই সহ আঙুলের বিভিন্ন জয়েন্টে ছড়াতে পারে। একই সঙ্গে জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়, দীর্ঘদিন এই ব্যথা স্থায়ী হলে জয়েন্ট বিকৃত হতে পারে। আক্রান্ত স্থানে, অর্থাৎ শরীরের জয়েন্টে লালচে ও ফোলাভাব সহ আক্রান্ত স্থানে গরম অনুভব হতে পারে।
কিডনি সংক্রান্ত সমস্যার লক্ষণঃ
- আমরা সকলেই জানি, রক্তে থাকা পিউরিন ভেঙ্গে ইউরিক এসিড তৈরি হয়, যা কিডনি সাহায্যে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। যদি কিডনি এমন কাজ সঠিকভাবে করতে না পারে সেক্ষেত্রে কিডনিতে ব্যথা অর্থাৎ কোমরের দুই দিকে তীব্র ব্যথা অনুভব হতে পারে।
- এ সময় প্রস্রাবের রং ঘোলাটে বা লালচে হবার সম্ভাবনা রয়েছে। ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়ার সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণ অনেকটা কমে যাওয়া সহ প্রসাবে তীব্র দুর্গন্ধ লক্ষ্য করতে পারেন। শরীরের অতিমাত্রায় ইউরিক এসিড উচ্চ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, যা কিডনির জন্য খুবই ক্ষতিকর।
- অতিমাত্রায় ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার ফলে কিডনিতে পাথর, হওয়ার মত সমস্যার দেখা দিতে পারে। কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে বমি বমি ভাব সহ বমি ও অনেকের ক্ষেত্রে হতে পারে। অতিমাত্রায় ইউরিক এসিড বাড়ার লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে, এটি কিডনি ফেইলিউর অর্থাৎ ক্রনিক কিডিনি ডিজিজ হতে পারে।
রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে করণীয়
ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ এবং করণীয় কি? আর্টিকেলটিতে, ইতিমধ্যে রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার কিছু লক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। রক্তে ইউরিক এসিড বাড়া যদিও সাধারণ সমস্যা, তবে নিয়ন্ত্রণে না আনলে শরীরে, বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এজন্য আপনি যদি এমন লক্ষণ অনুভব করেন, সেক্ষেত্রে কিছু ঘরোয়া প্রতিকার সহ চিকিৎসার মাধ্যমে, ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
আরো পড়ুনঃ হার্টের সমস্যার লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানুন।
- আপনার শরীরে যদি ইউরিক আসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মত লক্ষণ অনুভব হয়। সেক্ষেত্রে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন জরুরী, যে সকল খাবারের কারণে পিউরিন বেশি উৎপাদন হয় তা পরিহার করুন। অতিরিক্ত চিনি অ্যালকোহল সহ কোমল পানীয়, ইউরিক এসিডের পরিমাণ বাড়ায় মাথায় রাখবেন।
- সেই সঙ্গে যে সকল খাবার উপকারী সেগুলোর মধ্যে, লাউ, কুমড়া, পটোল, শসা সহ টক ফল কমলালেবু ও আপেল খেতে পারেন। কম চর্বিযুক্ত দুধ এবং দই খাওয়া এ সময় উপকারী। আপনি চাইলে, চেরি, গ্রিন টি সহ পরিমাণ মতো কফি খেতে পারে, এগুলো ইউরিক অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে।
- দৈনিক রুটিন করে হালকা শারীরিক পরিশ্রম করুন, প্রয়োজন হলে ব্যায়াম উপকারী। আপনার অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা কমানোর, চেষ্টা করুন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এ সময়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা থেকে বিরত থাকুন। শরীরের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম নিশ্চিত করুন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এগুলো খুবই কার্যকরী।
- উপরে উল্লেখিত ঘরোয়া প্রতিকারের পাশাপাশি, চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত জরুরী। আপনার ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গেলে, নিয়মিত পরীক্ষা করাতে ভুলবেন না। চিকিৎসক যদি পরীক্ষা করে আপনাকে ওষুধ সেবনে উৎসাহিত করে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের, পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন।
উপসংহার। ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ এবং প্রতিকার
আজকের আর্টিকেলটিতে, ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে আপনার যদি এমন লক্ষণ দেখা দেয় একই সঙ্গে, হঠাৎ পায়ের বুড়ো আঙ্গুল সহ শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হয়। এবং বারবার ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া সহ কিডনিতে কোন প্রকার সমস্যা থাকে। সেক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না। ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া যদিও সাধারণ সমস্যা, তবে মাথায় রাখবেন নিয়ন্ত্রণে না আনা হলে, মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকি তৈরি করতে পারে।
এজন্য আপনার এবং আপনার পরিবারের, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য, স্বাস্থ্য সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন।
(খোদা হাফেজ)



ভদ্রতা বজায় রেখে কমেন্ট করুন! কারন,প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url